ব্লগ

আমাদেরকে শান্তি ও ঐক্যের পথে চলতে হবে

তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। মুসলিম বিশ্বের সাম্প্রতিক নানা সংকট নিরসনে তিনি অন্যদের চেয়ে দৃশ্যত মূখ্য ভূমিকা পালন করে চলছেন। সিরিয়া ও ইরাকে শিয়া-সুন্নী বিভেদকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক অস্থিতিশীলতার নিরসন কিভাবে করা যায়, তা নিয়ে তুর্কি পত্রিকা ডেইলি সাবাহয়ে গত ১৯ জুলাই তিনি একটি আর্টিকেল লেখেন। এ জাতীয় বিরোধের ক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি কি হওয়া উচিত, তা বিভিন্নভাবে বলার চেষ্টা করেছেন তিনি। আর্টিকেলটি অনুবাদ করা হলো।

সাম্প্রতিককালের ঘটনা মুসলিম বিশ্বে শিয়া-সুন্নী সম্পর্কের টানপোড়েনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ইরাক, সিরিয়া এবং অন্যান্য স্থানে চরমপন্থীরা ইসলামের নামে হত্যাকান্ড পর্যন্ত করছে। যারা অন্য মুসলিমদের কাফির আখ্যা দিয়ে সুন্নী কিংবা শিয়া দলের নামে হত্যা করে, তারা মূলত ইসলামের মৌলিক নীতিই লঙ্ঘন করে। এ ধরনের বর্বরোচিত আচরণের ব্যাপারে শিয়া ও সুন্নী উভয় দলেরই নিন্দা জানানো উচিত।

যে কোন ধরনের চরমপন্থাকে ইসলাম বাতিল বলে ঘোষণা করে। সহিংসতা বা সন্ত্রাসবাদকে ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলাম আমাদেরকে সংযত আচরণ করতে শেখায় এবং সকল কাজকর্মে ভারসাম্য বজায় রাখতে উৎসাহ দেয়। কুরআনে মুসলিমদেরকে চিহ্নিত করা হয়েছে এভাবে, ‘ (এরা) সেই দল যারা মধ্যপন্থা অবলম্বন করে’ (উম্মাতান ওয়াসাতাহ), সকল চরমপন্থার বিরুদ্ধে যার অবস্থান। কুরআন মুসলমানদেরকে সকলের জন্য শান্তি, ন্যায়বিচার ও সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্ধুদ্ধ করে।

ইসলাম সহিংসতা বা চরমপন্থাকে সমর্থন করে বলে যে দাবি করা হয়, সত্য ঠিক তার বিপরীত। ইসলামের আক্ষরিক অর্থ হলো শান্তি। এই ধর্ম আমাদের নিজেদের সাথে, অন্য মানুষদের সাথে, পরিবেশের সাথে ও বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা খোদার সাথে শান্তির সম্পর্ক স্থাপনের শিক্ষা দেয়। বিশ্বাস, গুণাবলী আর সৎকর্মের মাধ্যমেই এই শান্তি অর্জন করা যায়।

এটাই ঈমানদার হওয়ার মূলনীতি। ‘মুসলিম’ শব্দের অর্থ হচ্ছে যে ব্যক্তি খোদার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে ও বিশ্বজনীন নৈতিক গুণাবলী নিজের জীবনে ধারণ করে। তাই যারা রক্তপাত ঘটাচ্ছে তারা মূলত কুরআন ও হাদীসের সবচেয়ে মৌলিক নীতিগুলোকেই লঙ্ঘন করছে।

শিয়া ও সুন্নীরা একই সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করে ও তাঁর নবী মুহম্মদ (সা)-কে অনুসরণ করে। পার্থক্য বা মতভেদের চাইতে দুই দলের মধ্যে মিলই বরং বেশি। নামাজ পড়ার সময় আমরা সবাই একই ক্বিবলা কাবার দিকে মুখ ফিরাই। ন্যায়বিচার, শান্তি, ক্ষমা ও ঐক্যের ব্যাপারে একই নীতি অনুসরণ করি। আমরা সকলে বিশ্বাস করি, মৃত্যুর পর আমাদেরকে আবার পুনুরুত্থিত করা হবে এবং পৃথিবীর জীবনের কৃতকর্মের জন্য জবাবদিহি করা হবে।

সুন্নী এবং শিয়া জনগোষ্ঠী শতাব্দী জুড়ে একসাথে বসবাস করছে। ঐতিহাসিক ও বিধি-বিধানগত পার্থক্য দলীয় সহিংসতা, চরমপন্থা এবং সন্ত্রাসবাদের কারণ হতে পারে না। সুন্নী ও শিয়া আলেম, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, কবি, আধ্যাত্মিক নেতৃবৃন্দ, শিল্পী, ব্যবসায়ী এবং সমাজের নেতারা মানবতার জন্য একসাথে কাজ করেছেন। তারা ইসলামের ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্য রক্ষার্থে অবদান রেখেছেন। অন্যান্য সংস্কৃতি এই ঐতিহ্যকে অনুসরণ করেছে এবং তাদের সামনে আমাদের সংস্কৃতি সকল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একত্রে সহাবস্থানের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

শিয়া-সুন্নী উভয় গ্রুপকে এই ব্যাপারগুলো মনে রাখতে হবে এবং বর্তমান সমস্যাগুলো নিরসনে এই পন্থাগুলোর প্রচলন করতে হবে। মানুষকে একে অপরের কাছে নিয়ে আসতে হবে। ইসলামের দুটি পবিত্র উৎস থেকে শান্তি, ঐক্য ও ক্ষমার যে শিক্ষা পাওয়া যায় তা তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দকে  গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। চরমপন্থা, সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদ যা কিনা আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধকে লঙ্ঘন ও অসম্মান করে, আমাদের সকলকে সেগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে হবে।

সিরিয়া ও ইরাকের রাজনৈতিক বিভেদ ইতোমধ্যেই হাজার হাজার নিরীহ লোকের মৃত্যুর জন্য দায়ী। তুরস্ক থেকে এই রক্তপাত বন্ধ করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। আমরা মানুষের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও সম্মান আদায়ের ন্যায্য দাবি সমর্থন করে যাব। ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র নির্বিশেষে আমরা প্রায় এক মিলিয়ন সিরিয়ানের জন্য আমাদের দরজা খুলে দিয়েছি। পৃথিবীর সকল কোণে ভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের লোকদের জন্য আমরা মানবিক সহায়তা দিয়ে থাকি। আমাদের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ববোধ থেকেই আমরা তা করি।

এ কথা পরিষ্কার যে, কিছু লোকজন মুসলিম বিশ্বে দলীয় সহিংসতা সৃষ্টি করতে চায়। তারা ইরাক, সিরিয়া, ইরান, বাহরাইন, লেবানন, সৌদী আরব, ইয়েমেন, পাকিস্তান, ইন্ডিয়া ও অন্যান্য জায়গায় শিয়া ও সুন্নীদের মধ্যে বিভেদ লাগানোর চেষ্টা করছে; তাদের একে অপরের মসজিদ আর স্কুলে আক্রমণ করার জন্য উদ্ধু্দ্ধ করছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে তারা এদেরকে একে অপরের প্রতি লেলিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা ঐতিহাসিক মতপার্থক্যের সুযোগ নিয়ে আধুনিক যুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি করতে চাচ্ছে।

এগুলো বিরাট ফিতনা, অন্য কথায় গোত্রীয় বিবাদ ও বিশৃঙ্খলা। এর উদ্দেশ্য হলো মুসলমানদের মধ্যে ঘৃণার বীজ বপন করা। প্রত্যেক শিয়া ও সুন্নীকে এই দলীয় সংঘাতের বিরুদ্ধে অবস্থান করতে হবে এবং শান্তি ও ঐক্যের জন্য কাজ করতে হবে। ধর্মীয় বা দলীয় বিবাদ কারো জন্য লাভজনক হবে না, বরং তাতে ধর্ম ও মানবতা বিলীন হয়ে যাবে। এই দলীয় কোন্দল মুসলিম সমাজের সমস্যাগুলোকে আরো বাড়িয়ে তুলবে।

নিজেদের মধ্যে মারামারি না করে, বরং অবিচার, অন্যায়, দারিদ্র, অশিক্ষা, দুর্নীতি ও অনুয়ন্নয়নের বিরুদ্ধে মুসলমানদের লড়াই করা প্রয়োজন। আমাদের শহর ও দেশগুলোকে শিক্ষা, বিজ্ঞান, সৃষ্টিশীলতা ও সহাবস্থানের প্রাণকেন্দ্র বানানোর চেষ্টা করা উচিত। আমাদের মধ্যকার মতপার্থক্যকে সমৃদ্ধি ও শক্তির উৎস হিসেবে দেখতে হবে। আমাদের মনে রাখা উচিত আল্লাহ কেন মানুষকে ভিন্নভাবে সৃষ্টি করেছেন, “হে মানব, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিতি হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার”। (৪৯:১৩)

সুন্নী ও শিয়া মুসলিমদের জন্য শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ জীবন যাপনের আধ্যাত্মিক ও জাগতিক উপাদান রয়েছে। তাদের প্রত্যেকের সমতা, অর্থনৈতিক সুবিধা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকার রয়েছে। সামাজিক দু:খ-দুর্দশা ও রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে কাজে লাগিয়ে চরমপন্থীদের বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাত ঘটানোর সুযোগ করে দেয়া উচিত হবে না। রাজনৈতিক মতামত, অর্থনৈতিক অবস্থান বা বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে বিশ্বের সকল সুন্নী ও শিয়া জনগোষ্ঠীর শান্তি, ঐক্য ও ক্ষমার মূলনীতি ধারণ করা একান্ত প্রয়োজন।

এটাই ইসলামের শিক্ষা। আমাদের কাছে মানবতার দাবিও তাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *