ব্লগ

‘ঋদ্ধ সংলাপ’ বইটির কথিত অনুবাদকের প্রতারণাপূর্ণ দাবি প্রসঙ্গে

‘ঋদ্ধ সংলাপ’ বইটির প্রকাশনী প্রতিষ্ঠান নাফিয়ান পাবলিকেশন্সের প্রকাশকের সাথে ইমেইলে আমাদের কয়েক দফা যোগাযোগ হয়েছে। তারা সম্পূর্ণ ঘটনা স্বীকার করে ও নিজেদের কাঁধে দায় নিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছেন। এবং জানিয়েছেন, বইটি এখনো বাজারে ছাড়া হয়নি। নিজেদের ব্যবস্থাপনায় কুরিয়ারের মাধ্যমে এতদিন যেভাবে বইটি বিক্রি করে আসছিলেন, সেটিও করবেন না বলে নিশ্চয়তা দিয়েছেন। তাদের স্টকে থাকা বইয়ের অবশিষ্ট কপিগুলো বাজারজাত করা হবে না বলেও কথা দিয়েছেন।

আলী আহমাদ মাবরুরের ব্যাপারে তারা বলেছেন, “অনুবাদক আলী আহমাদ মাবরুর, দুই বছর আগে তারেক আল সোয়াইদানের দুটি লেকচারের অনুবাদ করলেও আমাদের ভুলের কারনে আমরা তার অনুবাদটি না দিয়ে বইটিতে সিএসসিএস’র করা অনুবাদটি দিয়ে দিয়েছি। যেহেতু মাসুদুল আলমের অনুবাদও সিএসসিএস এর ওয়েবসাইট নেয়া হয়েছে, তাই ভুলক্রমে ঐ অনুবাদটির পাশাপাশি তারেক আল সোয়াইদানের দুটি অনুবাদও একই ওয়েবসাইট থেকে নিয়ে বইটিতে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এটা অনিচ্ছাকৃত ভুল।”

প্রকাশকের পক্ষ থেকে এই বক্তব্যের পর আলী আহমাদ মাবরুরের উপর বাহ্যত আর দায়-দায়িত্ব থাকে না। কারণ, অনুবাদকের বক্তব্য ও প্রকাশকের বক্তব্যের মধ্যে মিল পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু আলী আহমাদ মাবরুর নিজের অনুবাদ দাবি করে ৩০ মে রাত ১টা ৪৪ মিনিটে যে অনুবাদটি ফেসবুক নোট আকারে প্রকাশ করেছেন (লিংক) এবং এর চার মিনিট পর রাত ১টা ৪৮ মিনিটে একটি ফরোয়ার্ডিং সহকারে যেটি পুনরায় শেয়ার করেছেন (লিংক), এই দুটি পোস্টের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে।

তাঁর দাবিকৃত এই নতুন অনুবাদটি আমরা বিশ্লেষণ করে দেখেছি। আমাদের অনুবাদের সাথে জনাব মাবরুরের অনুবাদের রয়েছে অস্বাভাবিক মিল। এমনকি অনেক জায়গায় লাইন বাই লাইন মিলে যায়। যাকে প্লেজারিজম, বিশেষত প্যারাফ্রেজিংয়ের দায়ে সুস্পষ্টভাবে অভিযুক্ত করা যায়। আমরা এ বিষয়ে কিছু তথ্য প্রমাণ নিচে তুলে ধরছি:

১.

অনুবাদটি মূলত কুয়েতি স্কলার ড. তারিক সোয়াইদানের। ২০১৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে নেতৃত্ব নিয়ে তিনি এই লেকচারটি দেন। যেটির মূল লিংক: https://www.youtube.com/watch?v=KH_wXTCP1XE। আপলোডকারী চ্যানেলটির কন্টেন্ট যেহেতু তাদের ঘোষণা অনুযায়ী কপিরাইটের আওতামুক্ত, তাই আমরা সেটি আমাদের চ্যানেলে আপলোড করি। লিংক: https://www.youtube.com/watch?v=VkawLbbhE1k এবং ওয়েবসাইটে আমাদের করা অনুবাদে আমরা আমাদের আপলোড করা ভিডিও লিংকটি দিয়েছি।

মজার ব্যাপার হলো, মাবরুর তাঁর অনুবাদ-নোটে আমাদের আপলোড করা ভিডিও লিংকটিই সোর্স হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অথচ মূল ভিডিওটি ‘TVSUNNAH চ্যানেলে সহজলভ্য। তাই তিনি যদি স্বাধীনভাবে অনুবাদ করতেন, তাহলে সেই লিংকটি দেয়াই ছিলো স্বাভাবিক। কেন তিনি আমাদের লিংকটি ব্যবহার করেছেন, সেটির সদুত্তর কী হতে পারে? স্ক্রিনশট দেখুন:

২.

খেয়াল করলে দেখবেন, মূল ভিডিওর শিরোনাম হলো- ‘Leadership Challenges For The New Millenium’, আমরা সরাসরি এর অনুবাদ না করে কন্টেন্ট বিবেচনায় শিরোনামের অনুবাদ করেছি- ‘সফল নেতৃত্ব গঠনে সুন্নাহসম্মত বাস্তব কর্মপন্থা’

ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো এই শিরোনামটিই মাবরুরের অনুবাদে সংক্ষেপ করে দেওয়া হয়েছে ‘সফল নেতৃত্ব: যথাযথ কর্মপন্থা’ হিসাবে। মূল শিরোনামের সাথে যার কোনো মিল নেই। বরং আমাদের অনূদিত শিরোনামের সাথে এটি অনেকাংশেই মিলে যায়! স্ক্রিনশট দেখুন:

৩.

ভিডিও বক্তব্যটি যথেষ্ট গোছালো ছিলো না। রিপিটেশন, অপ্রাসঙ্গিক কথা ইত্যাদি থাকায় প্রায় স্থানেই আমরা হুবহু অনুবাদ না করে ভাবানুবাদ করেছি। ফলে মূল ভিডিও বক্তব্যের সাথে আমাদের অনুবাদের হুবহু সামঞ্জস্য পাওয়া যাবে না।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভিডিও বক্তব্যের প্রথম তিন মিনিটের ভাবানুবাদ আমরা মাত্র ৩৩টি শব্দে প্রকাশ করেছি। সেই অনুবাদটুকুই দৃশ্যত কিছুটা ভাষাগত পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে মাত্র। তাঁর অনুবাদে শব্দসংখ্যা কিছু বেশি থাকলেও মূল বক্তব্য একই। কিন্তু তিনি যদি আমাদের অনুবাদ অনুসরণ না করে ভিডিও বক্তব্য অনুসরণ করতেন, তাহলে এই অংশটুকু আরো বড় হতো। আমাদের অনুবাদের বাইরে নতুন কিছু কথা সেখানে থাকাটাই ছিলো স্বাভাবিক। আলোচ্য অংশটুকুর স্ক্রিনশট:

৪.

আলোচনা বুঝার সুবিধার্থে মূল বক্তব্যটিকে আমরা বিভিন্ন শিরোনাম দিয়ে ৬টি সেকশনে ভাগ করেছি। এগুলো হলো–

১। ভূমিকা,
২। কৌশল ও পরিকল্পনা,
৩। ‘নেতৃত্ব’ বিশ্লেষণ,
৪। নেতৃত্ব কি জন্মগত নাকি অর্জনের ব্যাপার?,
৫। নেতৃত্ব প্রসঙ্গে কতিপয় অযৌক্তিক বিবেচনা,
৬। উপসংহার

প্রত্যেকটি শিরোনামের অধীনে আবার অনেকগুলো উপশিরোনাম ব্যবহার করেছি। এগুলো ভিডিও বক্তব্যে ছিলো না।

আশ্চর্যজনকভাবে মাবরুরের অনুবাদেও সেগুলোই অনুসরণ করা হয়েছে। আমাদের করা একটি সেকশন যেখান থেকে শুরু হয়ে যেখানে শেষ হয়েছে, তাঁর সেকশনগুলোও সে মোতাবেক শুরু এবং শেষ হয়েছে। কয়েকটি শিরোনামকে একটু এদিক-সেদিক করা হয়েছে মাত্র। তাঁর দেওয়া শিরোনামগুলো হচ্ছে:

১। ভূমিকা
২। কৌশল ও পরিকল্পনা
৩। ‘নেতৃত্ব’ পর্যালোচনা
৪। নেতৃত্ব কি সহজাত বৈশিষ্ট্য নাকি অর্জন করে নিতে হয়?
৫। নেতৃত্ব প্রসঙ্গে প্রচলিত কিছু ভুল ধারনা
৬। উপসংহার

এ ধরনের আরো একটি উদাহরণ দেয়া যাক। ‘কৌশল ও পরিকল্পনা’ সেকশনে পাঁচটি পয়েন্ট রয়েছে। আমরা এগুলোর অনুবাদ করেছি এভাবে:

১. অনৈসলামিক আচরণ
২. অদক্ষতা
৩. পশ্চাৎপদতা
৪. ফিকির (বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান) এবং
৫. নেতৃত্ব।

আর তিনি অনুবাদ করেছেন এভাবে:

১. ইসলাম বহির্ভুত আচরণ
২. অদক্ষতা
৩. পশ্চাৎপদতা বা অনগ্রসরতা
৪. বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানের দৈন্যতা এবং
৫. দুর্বল নেতৃত্ব।

মজার ব্যাপার হলো, পয়েন্টগুলোর প্রাথমিক উপস্থাপনায় তিনি কিছুটা রদবদল করলেও প্রতিটি পয়েন্টের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সেগুলো পরিবর্তন করতে ভুলে গেছেন। ফলে আমাদের শিরোনামগুলোই তাঁর অনুবাদে হুবহু রয়ে গেছে। স্ক্রিনশট দেখুন:

পাঠকদের সুবিধার্থে আমরা এগুলো যেভাবে দিয়েছি, তিনিও সেভাবে দিয়েছেন। তিনি এসব হুবহু কোথায় পেলেন?

৫.

দুটি অনুবাদেই কিছু বাক্য হুবহু রয়ে গেছে। প্ল্যাজারিজম সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারা বুঝবেন, প্ল্যাজারিজম না হলে স্বাভাবিক অবস্থায় এমনটি হওয়ার কথা নয়। ফাইন্ড অপশন ব্যবহার করে দুটি অনুবাদেই আপনি নিম্নোক্ত লাইনগুলো খুঁজে পাবেন:

ক.   ‘ড. তারিক, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না; বলতে পারেন, একেবারেই অজ্ঞ’।

খ. জন্মগত নেতৃত্বের আরেকটি উদাহরণ হচ্ছেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা)।

গ. খালিদ নিজেই নিজেকে নেতা বানিয়ে নিয়েছে। তার জন্যে নেতৃত্ব ছাড়া অন্য কিছুই মানায় না

ঘ. আলোচনার তৃতীয় বিষয়টি হলো, নেতৃত্ব এবং ব্যবস্থাপনার মধ্যে পার্থক্য। এটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ঙ. যুদ্ধে রাসূল (সা) কয়েকজনকে পর্যায়ক্রমে সেনাপতির দায়িত্ব দেন। তারা হলেন, জাফর ইবনে আবি তালিব (রা), যায়েদ ইবনে হারিসা (রা) এবং আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা)। তারা সবাই যুদ্ধে শহীদ হলে ইসলামের পতাকাও

চ. হাদীস শাস্ত্র আনুযায়ী, যদি একই বিষয়ে হাদীসের কমপক্ষে দুইটি সংস্করণ থাকে, তাহলে দুইটি হাদীসের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদি দুইটি হাদীসই সহীহ হয় তাহলে একটি গ্রহণ করে অন্যটিকে বাদ দেয়া যাবে না। যেমন, কুরআনে আল্লাহ সুবাহানাহু তায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা দাসদের মুক্ত করে দাও’। অন্য আরেকটি আয়াতে একই বিষয়ে আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা মুসলিম দাস মুক্ত করে দাও’। এখন, এ বিষয়ে আমাদের উচিত হবে

ছ. ‘কিতাবুল আহকাম’ অধ্যায়ে ‘ইমারত’ তথা নেতৃত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা থাকা সত্ত্বেও এ হাদীসটিকে সে অধ্যায়ে রাখা হয়নি। সুতরাং নেতৃত্বের

এগুলো হচ্ছে দাঁড়ি, কমাসহ ন্যূনতম পার্থক্য ছাড়া কয়েকটি উদ্ধৃতি। কিন্তু প্রায় প্রতিটি প্যারায় দেখা যাচ্ছে, দুয়েকটি শব্দগত পরিবর্তন ছাড়া আমাদের অনুবাদটির সাথে তাঁর করা অনুবাদটির তেমন কোনো পার্থক্য নেই। এ ধরনের প্যারাফ্রেজিং এত বেশি পরিমাণে হয়েছে যে, সবগুলো এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। জাস্ট কয়েকটি উদাহরণ দেয়া হলো:

উদাহরণ-১

উদাহরণ-২

উদাহরণ-৩

উদাহরণ-৪

৬.

নেতৃত্ব নিয়ে ড. সোয়াইদানের একটি সংজ্ঞা আমরা ইংরেজিতে উদ্ধৃত করেছি এবং একই সাথে সংজ্ঞাটির বাংলা অনুবাদও দিয়েছি। অবাক করা ব্যাপার হলো, আলী আহমাদ মাবরুরও একই স্টাইল অনুসরণ করেছেন! তিনি যদি সত্যিই মূল ভিডিও থেকে অনুবাদ করতেন, তাহলে একান্তই আমাদের এই স্টাইল অনুসরণ করার কথা ছিলো না। স্ক্রিনশটে দেখুন:

খেয়াল করুন, আলী আহমাদ মাবরুরের অংশের লেখাটুকু কিছু দুর্বোধ্য বাংলা শব্দের সমষ্টি। এর ব্যাখ্যা একটু পরই দিচ্ছি। তার আগে আরেকটি স্ক্রিনশট দেখুন:

খেয়াল করে দেখুন, ক্লারিফিকেশনের স্বার্থে অনুবাদের পাশাপাশি ব্র্যাকেটে আমরা যেভাবে মূল ইংরেজি ব্যবহার করেছি, হুবহু সেই কাজ তিনিও করেছেন। তবে তাঁর অনুবাদে সেগুলো এসেছে কিছু দুর্বোধ্য শব্দ হিসেবে। এই দুর্বোধ্য শব্দের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হতে পারে:

আমাদের ওয়েবসাইট থেকে ইউনিকোড বাংলা অনুবাদটি তিনি বা তাঁর প্রকাশনী সংস্থা প্রথমে বিজয় বাংলায় কনভার্ট করেছেন। এর কারণ হলো, বাংলাদেশের প্রেসগুলো এখনো সাধারণত বিজয় বাংলায় (নন-ইউনিকোড) চলে। পরে আমরা যখন আপত্তি জানাই, তখন আলী আহমাদ মাবরুর দাবি করেন, তিনি আমাদের অনুবাদের ব্যাপারে কিছু জানেন না। তিনি নিজের মতো করে অনুবাদ করে প্রকাশককে দিয়েছেন। এই দাবিকে জাস্টিফাই করতে নতুন একটি অনুবাদ হাজির করা তাঁর জন্য অপরিহার্য ছিলো। এই প্রয়োজন থেকে তিনি তাদের বিজয় বাংলার নন-ইউনিকোড ফাইলটি সম্ভবত পুনরায় ইউনিকোডে কনভার্ট করেন এবং সেটি যথাসম্ভব প্যারাফ্রেজিং করেন। এটিই তিনি ফেসবুকে নোট আকারে প্রকাশ করেন। এই কনভার্সনের কাজটি করতে গিয়েই শব্দগুলো দুর্বোধ্য রয়ে যায়।

আগ্রহী পাঠকগণ চাইলে বাংলা ওয়েব কনভার্টরে শব্দগুলো কনভার্ট করে দেখতে পারেন। একটি ওয়েব কনভার্টরের লিংক: Bangla Converter

নোটে ব্যবহৃত দুর্বোধ্য শব্দসমষ্টির তালিকা:

ক. ষবধফবৎংযরঢ় রং ঃযব ধনরষরঃু ঃড় সড়াব ঢ়বড়ঢ়ষব ঃড়ধিৎফং মড়ধষং.
খ. (ষবধফবৎংযরঢ় রং ধহ ধনরষরঃু)
গ. (সড়ারহম ঢ়বড়ঢ়ষব)

প্রকাশককে বলির পাঁঠা বানিয়ে প্ল্যাজারিজমের অভিযোগ থেকে তিনি আদৌ আত্মরক্ষা করতে পেরেছেন কিনা, তা বিবেচনার ভার সচেতন পাঠকের উপর রইলো।

১ thought on “‘ঋদ্ধ সংলাপ’ বইটির কথিত অনুবাদকের প্রতারণাপূর্ণ দাবি প্রসঙ্গে”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *