বাংলাদেশের সামাজিক পরিমণ্ডলে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব

লিখেছেন | ডিসেম্বর ১৩, ২০১৭

সংস্কৃতি কি ও কেন

সংস্কৃতির সংজ্ঞা নিয়ে তাত্ত্বিকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ই. বি. টেইলরের মতানুসারে বলা যায় সংস্কৃতি এমন একটি জটিল একক যা সামাজিক জীব হিসেবে মানুষ কর্তৃক অর্জিত সকল নীতি-নৈতিকতা, আইন, বিশ্বাস, জ্ঞান, প্রথা ইত্যাদির সমষ্টি বুঝায়। জাতিরাষ্ট্রের উত্থানের পর থেকে সংস্কৃতির ধারণা সামাজিক পরিসর থেকে জাতীয় পরিসরে উপনীত হয়েছে। তাই সংস্কৃতিকে একটি জাতির প্রাণ বলা চলে যার উপর ভিত্তি করে ঐ জাতি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলে। প্রাচীন যুগে সংস্কৃতি গড়ে তোলার ব্যাপারটা হাজির ছিল না। একটি নির্দিষ্ট সময় পর সমাজের মানুষ উপলব্ধি করত তাদের নিজস্ব একটি সংস্কৃতি রয়েছে। কিন্তু এই আধুনিক যুগে আমরা একটা সংস্কৃতিকে গড়ে তুলতে পারি। উদাহরণস্বরুপ, চায়নার “সাংস্কৃতিক বিপ্লব” এর কথা বলা যায়। আধুনিক যুগে প্রত্যেক জাতিই তার প্রকৃতি অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতিকে গড়ে তুলছে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য, জাতির ভবিষ্যত সমৃদ্ধির জন্য। হালজামানার হলিউড আমেরিকার কেবল বিনোদন শিল্পই নয়, তাদের সামাজিক বুনিয়াদ তৈরীর প্রকল্প। বারাক ওবামার মতে হলিউড তাদের পররাষ্ট্রনীতিরও অংশ বটে। যুক্তরাজ্যের বিবিসির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো একটা নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ভিশন নিয়েই প্রচার করা হয়। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এই সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রার শক্তিশালী হাতিয়ার।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও একটি সংস্কৃতি বিনির্মাণ এই জাতির মনন তৈরী ও ভবিষ্যত সমৃদ্ধিত্র জন্য অত্যাবশ্যক। স্বাধীনতার পর বিটিভি এই ভূমিকা পালনে বেশ সোচ্চার ছিল। সময়ের আবর্তনে প্রযুক্তিগত বিপ্লব ও বাণিজ্যিক স্বার্থের জোয়ারে বিটিভির অতীতের সেই ভূমিকা এখন আর হাজির নেই। স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের আগমনের ফলে আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে দেশীয় সংস্কৃতির চিত্র বদলে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

বাংলাদেশের স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল এর ইতিহাস

১৯৯১ সালে প্রথমবারের মত বাংলাদেশে স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল শুরু হবার আভাস পাওয়া যায়। ঐ সময় সিএনএন বাংলাদেশে সম্প্রচারিত হবে বলে পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে আইনগত জটিলতার কারণে তা আর হয়ে উঠে নি। যদিও ঐ সময় স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের যাত্রা শুরু হয়নি, তবুও এদেশের দর্শক বিদেশী টিভি প্রোগ্রামের সাথে বেশ পরিচিত ছিল। এক রিপোর্টে দেখা যায়, সেসময় বিটিভির ৩২ শতাংশ প্রোগ্রাম ছিল বিদেশী। ৭০ কিংবা ৮০’র দশকে মধ্যবিত্ত বাঙ্গালি সমাজ হিন্দি সিনেমার প্রতি যথেষ্ট ঝুঁকে পড়ে বলা চলে। ঐ সময় বিটিভি এবং দেশীয় সিনেমা হলে হিন্দি সিনেমা প্রদর্শনের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ভিসিআর এর আগমনে হিন্দি সিনেমার প্রসার শহরে এবং পরবর্তীতে গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৯২ সালে TVRO (Television Receive Only) আইনগতভাবে চালু হবার পর থেকে উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। উচ্চমূল্যর কারণে তা মধ্যবিত্ত সমাজের নাগালের বাইরে থেকে যায়। ১৯৯৩ সালে ক্যাবল ওপারেটরদের সুবাদে স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল মধ্যবিত্ত সমাজের নাগালে আসে। পরবর্তীতে সিএনএন, স্টার, জি টিভিসহ নানা হিন্দি টিভি চ্যানেলের আগমন ঘটে। তখন থেকেই হিন্দি টিভি চ্যানেল এদেশের সংস্কৃতিতে প্রভাব বিস্তার করা শুরু করে। ১৯৯৪ সালে সেণ্টার ফর কমিউনেকেশন এন্ড রিসার্চের এক জরিপে দেখা যায় ৪১ শতাংশ টিভি দর্শক জি টিভির ভক্ত। পরবর্তীতে হিন্দি চ্যানেলের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করতে বেশ কিছু বাংলাদেশী স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের আগমন ঘটে যার মধ্যে একুশে টিভি, এটিএন বাংলা, চ্যানেল আই উল্লেখযোগ্য।

ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব

একসময় মূলতঃ হিন্দি সিনেমাই বাংলাদেশের ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে আসছিল। বর্তমানে মাত্র ২০০-৩০০ টাকার বিনিময়ে গ্রামাঞ্চলের দর্শকরাও ১৫টির বেশি বাংলাদেশী চ্যানেল এবং ৩০টিরও বেশি ইন্ডিয়ান চ্যানেল দেখার সুযোগ পাচ্ছে যার ১২টিরও বেশি হিন্দীতে প্রোগ্রাম সম্প্রচার করে। এসব চ্যানেলের প্রোগ্রামের মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে টিভি সিরিয়াল বা সোপ ওপেরা ব্যাপক জনপ্রিয়। এ বছরের ১৫ জুন প্রথম আলোয় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয় যে একটি জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে টেলিভিশন দেখেন-এমন নারীদের ৬৬ শতাংশের বেশি অধিকাংশ সময় ভারতীয় টিভি চ্যানেল দেখেন। চ্যানেলগুলোর শীর্ষে রয়েছে স্টার জলসা। বাংলাদেশের ৫৮ শতাংশ নারী দর্শক নিয়মিত এই চ্যানেলটি দেখেন। সরকারের পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ ও আচরণ পরিবর্তন কর্মসূচির প্রভাব যাচাই-বিষয়ক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে ওই জরিপের তথ্য প্রকাশ করা হয়। জরিপটি করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ। জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৯০ শতাংশ নারী টেলিভিশন দেখে। এদের ৫৮ দশমিক ২ শতাংশ অধিকাংশ সময় ভারতীয় চ্যানেল স্টার জলসা দেখে, ৬ দশমিক ৬ শতাংশ জি বাংলা এবং ১ দশমিক ৮ শতাংশ দেখে স্টার প্লাস চ্যানেল। রাষ্ট্রীয় চ্যানেল বাংলাদেশ টেলিভিশন নারীরা বেশি দেখে। এই হার ১৯ দশমিক ১ শতাংশ।

এসব সিরিয়াল মূলত বাংলা ভাষাতেই সম্প্রচারিত হচ্ছে। সন্ধ্যা হতেই স্টার জলসা কিংবা জি বাংলার সিরিয়াল দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে পরিবারের নারী সদস্যারা। দেশ টিভির সাপ্তাহিক “যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো” অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ইণ্ডিয়ান সিরিয়ালের প্রভাব নিয়ে একটি আলোচনা হয়। ঐ আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা অহিদ ইণ্ডিয়ান সিরিয়াল জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে ভাষাগত মিল বা নৈকট্যকে অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন ইংরেজী সংস্কৃতি ভাষাগত দূরত্বের কারণে খুব বেশি প্রভাব বিস্তার করতে না পারলেও বাংলা ভাষার সাথে হিন্দী ভাষার প্রচুর মিলের কারণে হিন্দী সিরিয়াল সহজেই দর্শকদের মন জয় করতে সক্ষম হচ্ছে। এছাড়াও ভারত হতে বাংলায় যেসব সিরিয়াল প্রচারিত হচ্ছে তা সাংসারিক জটিলতা-কুটিলতা, বউ-শ্বাশুরির দ্বন্দ্ব এসবকে তুলে আনায় নারী সমাজের মাঝে এসব সিরিয়ালের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে এসব সিরিয়ালে সামাজিক কুপ্রভাব কতটা ভয়ংকর রুপ ধারণ করেছে তা কয়েকটি ঘটনাতেই প্রমাণিত হয়। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে ঈদ উপলক্ষ্যে বাবা-মা এর কাছে থেকে “পাখি” নামের পোশাক চেয়ে না পাওয়ায় আত্মহত্যা করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক কিশোরী। এর ফলে বাবা-মা এর বিচ্ছেদও ঘটে। এর কদিন পরই “পাখি” পোশাক না পেয়ে গাইবান্ধায় আরেক কিশোরী আত্মহত্যা করে। ভারতের স্টার জলসা চ্যানেলের ‘বোঝে না সে বোঝে না’ সিরিয়ালের একটি চরিত্রের নাম পাখি। এই চরিত্রের পরনে থাকা বিশেষ একধরনের থ্রি-পিস সেবারের ঈদে বাংলাদেশের বাজারে ব্যাপক বিক্রি হয়। ভারত থেকে আসা এই ‘পাখি’ থ্রি-পিসে বাংলাদেশের বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। ২০১৫ সালের জুলাই মাসে জেলার শেরপুর উপজেলায় ঈদের জামা কিরণমালা কিনে না দেওয়ায় চণ্ডিপুর গ্রামের সাইফুল ইসলামের মেয়ে ছোনকা দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী ছাবিনা খাতুন নিজের ওড়না গলায় গলায় পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে।ঈদ উপলক্ষে ওই ছাত্রী ভারতীয় সিরিয়ালের নায়িকার নামানুসারে কিরণমালা জামা কিনে দেওয়ার জন্য তার বাবার কাছে দাবি জানায়। কিন্তু দরিদ্র বাবার পক্ষে মেয়ের আবদার রক্ষা করতে না পারায় অভিমানে মেয়ে আত্মহত্যা করে।

২০১৫ সালের আগষ্ট মাসে ভারতীয় সনি টিভির ক্রাইম সিরিয়াল দেখে অনুপ্রাণিত নাটোর জেলার আশরাফুল উলুম মাদ্রাসার তিন কিশোর ছাত্র সিরিয়ালের গল্পের মতই নিজের বন্ধুকে অপহরন করে মুক্তিপনের দাবী করে। মুক্তিপণ না পেয়ে তারা বন্ধুকে নৃশংসভাবে খুন করল। মাদ্রাসাছাত্র তানভীরের লাশটি উদ্ধার করা হয়েছিল একটি সেপটিক ট্যাংক থেকে।

যমুনা টিভির ইনভেস্টিগেশন ৩৬০ ডিগ্রীর “সংস্কৃতির এপার-ওপার” পর্বে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর বিষয় উঠে আসে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাচ্চাদের খাতা, কলম-পেন্সিল, বেলুন, স্টীকার ইত্যাদি জায়গায়  এখন কিরণমালার ছবি দেখা যায়। ভারতের টিভি সিরিয়াল বাংলাদেশের দর্শকদের বিমোহিত করে রাখলেও পশ্চিমবঙ্গে এসবের আকর্ষণ কম। “বোঝে না সে বোঝে না” কিংবা “কিরণমালা এসবের চেয়ে রিয়েলিটি শো যেমন দাদাগিরি অনেক জনপ্রিয় ওপার বাংলায়। বাংলাদেশেও এসব রিয়েলিটি শো এর থাবা থেকে মুক্ত নয়। রাজধানীর সেগুনবাগিচা হাইস্কুলে মীরাক্কেল-৬ এর অডিশনে উপচে পড়া ভীড় দেখা যায় দেশের তরুণদের যাদের বাংলাদেশী টিভি প্রোগ্রামের প্রতি আকর্ষণ নেই বললেই চলে। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ব্র্যাক মানবাধিকার ও আইন সহায়তা কেন্দ্রের মাঠ পর্যায়ের সমন্বয়কারী রমজান আলীর সাথে আলাপে টিভি সিরিয়ালের কারণে সৃষ্ট দাম্পত্য সমস্যা ও পারিবারিক কলহের কথাও উঠে আসে।

সাংস্কৃতিক এই কুফল টেকাতে স্টার জলসা, স্টার প্লাস ও জি বাংলা—ভারতীয় এই তিনটি টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধে সাত দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা চেয়ে ৭ আগস্ট আইনজীবী সৈয়দা শাহীন আরা লাইলী রিট আবেদন করলেও আদালত পরবর্তীতে তা খারিজ করে দেন। ভারতীয় সংস্কৃতির এই আগ্রাসন ঠেকাতে ব্যর্থ হলে এদেশের নৈতিক-পারিবারিক কাঠামো অতিশীঘ্রই ভেঙ্গে পড়বে।

দেশীয় টিভি চ্যানেলের হালচাল

দর্শকদের মতামত পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশী দর্শকদের দেশীয় চ্যানেল বিমুখতার পেছনে অন্যতম একটি কারণ মাত্রাতিরিক্ত বিজ্ঞাপন। ভারতীয় সিরিয়ালগুলো বলতে গেলে বিজ্ঞাপনমুক্ত। বাংলাদেশী নাটক নির্মাতাদের মতে বিজ্ঞাপনের এই আধিক্যের পেছনে মূল কারণ হল বাণিজ্যিক বাস্তবতা। ভারতের চ্যানেলগুলোর আয়ের উৎস বিজ্ঞাপন নয়, বরং দর্শকরাই চ্যানেলকে সরাসরি অর্থ পরিশোধ করছে ক্যাবল অপারেটরদের মাধ্যমে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের চ্যানেল মালিকদের সম্পূর্ণভাবে বিজ্ঞাপনের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বাংলাদেশে যদি পে সিস্টেমের আওতায় গ্রাহকদের নির্দিষ্ট কয়েকটি চ্যানেল কিনে দেখতে হত তাহলে একদিকে যেমন ভারতীয় চ্যানেলের অবাধ প্রবেশ রোধ হত অন্যদিকে দেশীয় চ্যানেল বাণিজ্যিকভাবে সফল হত এবং বাজার দখল করতে সক্ষম হত।

পাশাপাশি বাজেট ঘাটতি এবং মানের প্রতি কম গুরুত্বারোপ অনেকাংশে দায়ী। ভারতীয় প্রোগ্রামসমূহের ১ ঘণ্টার প্রোগ্রামের বাজেটের পাঁচ ভাগের এক ভাগ বাজেটে বাংলাদেশের প্রোগ্রাম তৈরী করা হয় বলে জানান বাংলাভিশনের অনুষ্ঠান প্রধান শামীম শাহেদ। পাশাপাশি প্রোগ্রামের মার্কেটিং এবং রিসার্চ সেক্টরেও পিছিয়ে আছে বাংলাদেশের নির্মাতারা। ফলে নিম্নমানসম্পন্ন প্রোগ্রাম দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

আধুনিকতা নাকি নির্ভরতা

বিশ্বায়নের এই যুগে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের শক্তিশালী মাধ্যম স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল। স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের প্রসার নিয়া তাত্ত্বিকদের মধ্যে দুই ধরণের মত রয়েছে। আধুনিকায়নের পক্ষের তাত্ত্বিকদের মতে আধুনিকায়ন হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যা অনুন্নত দেশসমূহকে উন্নত দেশের বৈশিষ্ট্য অর্জনে সহায়তা করে। গণমাধ্যম এই আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার একটি কার্যকর অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। গণমাধ্যমের সাহায্যে ঐতিহ্য-প্রথাকে দুর্বল করে আধুনিকতার পথ সুগম করা আধুনিকায়নের একটি প্রক্রিয়া বলে এই তাত্ত্বিকদের মত। কেননা তাদের মতে এই সকল ঐতিহ্য-প্রথা আধুনিকতার পথে প্রতিবন্ধকতা।

উত্তর-আধুনিক যুগে আধুনিকায়নের তত্ত্ব এমনিতেই প্রশ্নবিদ্ধ। আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া পাশ্চাত্য সভ্যতাকে উচ্চতর মর্যাদায় আসীন করে বাদবাকি দুনিয়াকে “সভ্য” করার এক মহান দায়িত্ব অর্পণ করে। অপরাপর জাতি-সভ্যতা সম্পর্কে এমন হীন ধারণা “ইউরোপকেন্দ্রিক” চিন্তাচেতনার ফসল তাতে সন্দেহ নাই। পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক মডেল একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বাস্তবতার আলোকে নির্মিত। একে সার্বজনীন বলার কোন জো নেই। নিজ দেশের কৃষ্টি-কালচারকে বিসর্জন দিয়ে সমৃদ্ধির পরিবর্তে জাতিগত দেওলিয়াপনার সৃষ্টি হয়। তাই নির্ভরতা-তত্ত্বের তাত্ত্বিকদের মতে স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, ভাষার বিকৃতি, অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রভৃতির হাতিয়ার।

এই দুই প্রকার তত্ত্বকে বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশে ভারতীয় চ্যানেলের জনপ্রিয়তাকে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন না বলে উপায় নেই। বাংলাদেশের জনমানুষের সাংস্কৃতিক চেতনা, সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিক কাঠামো ইত্যাদির সাথে ভারতের সাম্প্রতিক আধুনিকতা প্রভাবিত সাংস্কৃতিক পরিবেশের যথেষ্ট দূরত্ব রয়েছে। ভারতের এই সাংস্কৃতিক নবরূপও যে তাদের নিজস্ব নয় তাও স্মরণ রাখা উচিত। যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় প্রোগ্রাম আমেরিকান আইডলকে অনুকরণ করে ইণ্ডিয়ান আইডল এবং তা পরবর্তীতে আমাদের দেশে বাংলাদেশ আইডল নামে প্রোগ্রাম হিসেবে চালু হয়। আরো উদ্বিগ্ন হবার বিষয় হল বাংলাদেশে ভারতীয় চ্যানেলের অবাধ প্রবাশ ঘটলেও ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশী টিভি চ্যানেল সম্প্রচারিত হয় না। এমনকি যৌথ প্রযোজনায় যে সকল নাটক তৈরী হচ্ছে যমুনা টিভির অনুসন্ধানে দেখা যায় বাস্তবে ভারতীয় বাজারে তা একক প্রযোজনা হিসেবে দেখানো হচ্ছে। বিশ্বায়নের যুগে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান একটি বহুল আলোচিত ধারণা। কিন্তু বিশ্বায়নের সমালোচকেরা বলেন সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের নামে মূলতঃ প্রভাবশালী সভ্যতা-সংস্কৃতির আধিপত্য বিস্তার হচ্ছে এবং এর বাজার সম্প্রসারিত করা হচ্ছে। আদতেই যদি সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ঘটত তবে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ভারতীয় বাজারে অবাধ প্রবেশের সুযোগ পেত।

শেষকথা

একসময় বাংলাদেশের নাটক দেশবাসীর মন জয় করতে সক্ষম হয়েছিল। হুমায়ুন আহমেদ রচিত “কোথাও কেউ নেই” নাটকের “বাকের ভাই” চরিত্র কিংবা শহীদুল্লাহ কায়সার রচিত নাটক “সংশপ্তক” বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গেও অনেক জনপ্রিয় ছিল। বিটিভির সেই স্বর্ণযুগের পেছনে অবদান রয়েছে মেধাবী ও নিষ্টাবান শিল্পী ও নির্মাতাদের। সংস্কৃতি কেবল বিনোদন নয়, এটি জাতিস্বত্তা গঠনের এক মহান প্রকল্প। বাঙ্গালী জাতিস্বত্তাকে শক্ত গাঁথুনীর উপর দাঁড় করাতে চাইলে আমাদের এই সংস্কৃতি বিনির্মাণের কর্মযজ্ঞে পুনরায় মেধাবী ও নিষ্টাবান মানুষকে স্থান দিতে হবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল অ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো পূরণ করা আবশ্যক।