সমসাময়িক রাজনৈতিক ফিকাহর দিক-বিদিক: পর্ব-৪

লিখেছেন | জুন ১৮, ২০১৪

সমসাময়িক রাজনৈতিক ফিকাহর তৃতীয় ধারাটি হচ্ছে আধুনিক পশ্চিমা গণতন্ত্র এবং ইসলামী রাষ্ট্র চিন্তার মাঝে সমন্বয়ের প্রচেষ্টারত চিন্তাবিদগণ। এ ধারার চিন্তাবিদদের রচনার প্রধান দুইটি বৈশিষ্ট্য হলো-

১। তাঁরা ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বরূপ উপস্থাপন করেছেন।
২। তারপর আধুনিক পশ্চিমা গণতন্ত্রের স্বরূপ ও তার সাথে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার মিল-অমিলগুলো বিস্তারিত আলোচনা করে উভয়ের মাঝে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেছেন ।

ইসলামী রাজনৈতিক ফিকাহর যে ধারাটি মানব উদ্ভাবিত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কোনোরূপ বিবেচনায় না নিয়ে চূড়ান্তভাবে অস্বীকার করে, তাঁদের বিপরীতে এ চিন্তাধারা জন্ম লাভ করে। ইসলাম এবং পশ্চিমা গণতান্ত্রিক চিন্তার মাঝে বিদ্যমান দ্বন্দ্ব দূর করতে একটি বাস্তবসম্মত বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপের দিকেই এ ধারার আহবান।

এ ধারার ফিকাহর চিন্তাবিদদের মাঝে যার নাম আগে আসে তিনি হচ্ছেন উনিশ শতকের মহান সংস্কারক শেখ মোহাম্মদ আব্দুহ (১৯০৫-১৯৪৯)। তিনি ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তাকে ঘিরে যে ভুল ধারণা দীর্ঘকাল থেকে মুসলিম মানসে বিরাজ করছিল, তা সংশোধনের মাধ্যমে তাঁর কাজ শুরু করেন। ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাকে যারা ধর্মীয় রাষ্ট্রের খোলসে আবদ্ধ মনে করতেন তিনি তাদের সমালোচনা করেন। তিনি ঘোষণা করেন, ইসলামী রাষ্ট্রের প্রকৃতি দ্বীনি বা ধর্মীয় নয়, বরং মাদানী-রাষ্ট্র (যে রাষ্ট্র প্রকৃতিগত দিক থেকে ধর্মরাষ্ট্র এবং মিলিটারি-রাষ্ট্রের বিপরীত)। শেখ মোহাম্মদ আব্দুহ এ বিষয়ে ১৯৬০ সালে রচিত তাঁর الإسلام بين العلم والمدنية(জ্ঞান ও মাদানিয়্যার মাঝে ইসলামের অবস্থান) বইয়ে বিস্তারিত দলিল-প্রমাণসহ আলোচনা করেছেন। এ গ্রন্থের السلطان في الإسلام (ইসলামে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব) অধ্যায়ে নিম্নোল্লেখিত বিষয়গুলো তুলে ধরেন:

  • খলিফা বা রাষ্ট্রপ্রধান معصوم তথা সকল প্রকার ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বেনন, কিংবা ধর্মীয় ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো ক্ষমতার অধিকারী নন।
  • উম্মাহর হাতেই খলিফার নিয়োগ এবং প্রয়োজনে ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষমতা।
  • ইসলামে কোনো বিশেষ ধর্মীয় শ্রেণীর অস্তিত্ব নেই, যেমনটা হয়েছিল মধ্যযুগে ইউরোপের গির্জা কেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বেলায়।
  • ক্ষমতার পৃথকীকরণ (separation of power) নীতির দিক থেকে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা আধুনিক গণতন্ত্রের সাথে বিশেষভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ।

এ চারটি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার সারমর্ম হচ্ছে, ইসলামী রাষ্ট্রের খলিফা ‘মাসুম’ বা ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে কোনো ব্যক্তি নয়। তাঁর কাছে কোনো ঐশী নির্দেশনা আসে না। কোরআন-সুন্নাহর মনগড়া ব্যাখ্যা প্রদান এবং তা উম্মাহর উপর চাপিয়ে দেয়ার ক্ষমতাও তাঁর নেই। এ কথা সত্য, মুজতাহিদ হিসেবে ইজতিহাদের ক্ষমতা তার থাকবে, কিন্তু অন্য আর দশজন মুজতাহিদের চেয়ে বিশেষ কোনো স্থান তাঁর নেই। যদি তিনি কোরআন-সুন্নাহর মূলনীতির আলোকে শাসনকার্য পরিচানা করেন তাহলে উম্মাহ তাঁর আনুগত্য করতে বাধ্য। তবে কোরআন-সুন্নাহর মূলনীতির বাইরে চলে গেলে তাঁকে পদচ্যুত করা উম্মাহর উপর ওয়াজিব। উম্মাহ তাঁর উপর সকল প্রকার আইনসম্মত নিয়ন্ত্রণ আরোপের অধিকারী। আর খলিফা বা রাষ্ট্রপ্রধান সমগ্র উম্মাহর পক্ষ থেকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকারী।

সুতরাং কোনোভাবেই ইসলামী খেলাফতকে ইউরোপীয় theocracy (স্রষ্টার পক্ষ থেকে বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে শাসন) বা ধর্মীয় শাসনের সাথে তুলনা করা চলে না। ইউরোপীয় theocracy-তে শাসকরা মনে করত, তারা স্রষ্টার পক্ষ থেকে বিশেষ ক্ষমতাপ্রাপ্ত, শরিয়ত তথা আইন প্রনয়ন বা স্রষ্টা প্রদত্ত শরিয়তের ব্যাখ্যা প্রদানের বিশেষ ক্ষমতা একমাত্র তাদেরই হাতে। আর এটিই ছিল মধ্যযুগের গির্জা কর্তৃক শাসনের চরম বাস্তবতা। [বাংলাদেশের বিশেষ কিছু ধর্মীয় শ্রেণী এখনো এ ধরনের চিন্তা পোষণ করেন। তাঁরা মনে করেন, কোরআন-হাদিস ব্যখ্যার অধিকার আল্লাহ শুধু তাদেরকেই দিয়েছেন। বাকিরা সবাই তাদের ইত্তেবা করতে বাধ্য। বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে এদের তৎপরতা বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়।]

ইসলামী ঐতিহ্যে ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেহেতু একই ব্যক্তির হাতে ছিল, তাই অনেকেরই ধারণা ইসলামী খেলাফত বুঝি মধ্যযুগের গির্জার মতই একপ্রকার ধর্মীয় শাসন। তাদের ধারণা, খলিফাই আইনপ্রণেতা এবং খলিফার হাতেই তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা রয়েছে। আর মুসলমানদের ঈমানের শর্ত হচ্ছে খলিফার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য। মুসলমানদের বুদ্ধি এবং উপলদ্ধি খলিফার আনুগত্যর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাদের আরো ধারণা মুসলমানরা ছিল খলিফাদের ধর্মীয় কর্তৃত্বের দাস। আর মুসলিম শাসকরা ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় বাধা, বিজ্ঞানের চরম সত্যের বিরুদ্ধে গিয়ে তারা কুসংস্কার এবং ভ্রান্ত বিশ্বাসের পক্ষাবলম্বনকারী ছিল।

ইমাম মোহাম্মদ আব্দুহ ইসলামী খেলাফত সম্পর্কে এ সকল ভ্রান্ত ধারণার সমালোচনা করে খেলাফতের প্রকৃত চিত্র তার গ্রন্থে তুলে ধরেন।

Leave a Reply